স্টক মার্কেট বা শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করার ঝুঁকি।
শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করার আগে এর ঝুঁকিগুলো ভালোভাবে বোঝা দরকার। অনেকেই শুরুতে শুধু লাভের দিকটা দেখেন,কিন্তু বাজার সবসময় একভাবে চলে না। কখনো শেয়ারের দাম বাড়ে,আবার কখনো হঠাৎ অনেক কমেও যেতে পারে। তাই না বুঝে বা কারও কথায় ভরসা করে টাকা বিনিয়োগ করলে বড় ধরনের লোকসান হতে পারে।
বিশেষ করে নতুনদের উচিত একবারে বেশি টাকা বিনিয়োগ না করে অল্প অল্প করে শুরু করা। কোনো শেয়ার কেনার আগে কোম্পানির ব্যবসা,আর্থিক অবস্থা এবং বাজার সম্পর্কে যতটা সম্ভব জেনে নেওয়া ভালো। মনে রাখবেন,শেয়ার বাজারে লাভের যেমন সুযোগ আছে,তেমনি টাকা হারানোর ঝুঁকিও রয়েছে।চলুন আজকের আর্টিকেলটিতে বিষয়টি বিস্তারিতভাবে জেনে নিই।
পেজ সূচিপএঃ স্টক মার্কেট বা শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করার ঝুঁকি বিস্তারিতভাবে জেনে নিন।
- স্টক মার্কেট বা শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করার ঝুঁকি
- বাজার ওঠানামা করলে কীভাবে টাকা কমে যেতে পারে
- কোম্পানি সম্পর্কে না জেনে শেয়ার কিনলে কী হতে পারে
- দেশের অর্থনীতিতে সমস্যা হলে শেয়ারবাজারে কী প্রভাব পড়ে
- গুজবে কান দিয়ে অন্যদের দেখে শেয়ার কেনার ঝুঁকি
- প্রতারণার ফাঁদে পড়ে বা শেয়ারের দাম কারসাজির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া
- সরকারি নিয়ম বদলালে বিনিয়োগকারীদের কী ধরনের সমস্যা হতে পারে
- ধার করে শেয়ার কিনলে কী ধরনের বিপদ হতে পারে
- সব টাকা এক জায়গায় বিনিয়োগ করলে যে ঝুঁকি হতে পারে
- শেষ কথাঃ স্টক মার্কেট বা শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করার ঝুঁকি
স্টক মার্কেট বা শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করার ঝুঁকি
স্টক মার্কেট বা শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করার ঝুঁকিটা অনেকেই শুরুতে তেমন গুরুত্ব দিয়ে দেখেন না। শেয়ার বাজারে ভালো লাভ করার সুযোগ আছে,তাই বিষয়টা অনেকের কাছেই বেশ আকর্ষণীয় মনে হয়। কিন্তু এখানে লাভ যেমন হতে পারে,তেমনি টাকাও কমে যেতে পারে। তাই বিনিয়োগ করার আগে ঝুঁকিগুলো সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা দরকার।
প্রথমেই আসে পুরো বাজারের ঝুঁকি। ধরুন,দেশের অর্থনীতিতে খারাপ সময় চলছে,রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থির হয়ে গেছে কিংবা বিশ্বজুড়ে বড় কোনো সংকট দেখা দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে অনেক সময় পুরো শেয়ার বাজারেই দরপতন হয়। তখন আপনার কেনা বেশিরভাগ শেয়ারের দাম একসঙ্গে কমে যেতে পারে। আর সেই সময় লোকসানে শেয়ার বিক্রি করলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বেড়ে যেতে পারে।
এরপর আছে নির্দিষ্ট কোনো কোম্পানির ঝুঁকি। আপনি যে কোম্পানির শেয়ার কিনেছেন,সেই কোম্পানির ব্যবসা খারাপ হয়ে গেলে,ব্যবস্থাপনায় সমস্যা দেখা দিলে,প্রতিযোগীদের কাছে পিছিয়ে পড়লে কিংবা কোনো বড় ধরনের অনিয়মের খবর সামনে এলে শেয়ারের দাম দ্রুত কমে যেতে পারে। ভালোভাবে গবেষণা করেও সব ধরনের ঝুঁকি আগে থেকে বোঝা সম্ভব নয়। কারণ ব্যবসায় হঠাৎ কী ঘটবে,সেটা সবসময় কারও নিয়ন্ত্রণে থাকে না।
আরেকটি বিষয় হলো শেয়ার বিক্রি করার সময় ক্রেতা পাওয়া। কিছু শেয়ারে লেনদেন কম থাকায় আপনি চাইলেই দ্রুত বিক্রি করতে পারবেন না। বিশেষ করে ছোট কোম্পানির শেয়ারে এমন পরিস্থিতি দেখা দিতে পারে। তখন বিক্রি করতে গিয়ে কম দামে শেয়ার ছাড়তে হতে পারে,আবার কখনো কিছু সময় অপেক্ষাও করতে হয়।
ইনফ্লেশন ও সুদের হারের বিষয়টাও মাথায় রাখা দরকার। আপনার বিনিয়োগ থেকে যে লাভ হচ্ছে,সেটা যদি মূল্যস্ফীতির তুলনায় কম হয়,তাহলে টাকার প্রকৃত মূল্য খুব একটা বাড়ছে না। আবার সুদের হার বেড়ে গেলে অনেক মানুষ ব্যাংকের বিভিন্ন সঞ্চয় বা আমানতকে তুলনামূলক আকর্ষণীয় মনে করতে পারেন। এর প্রভাব শেয়ার বাজারেও পড়তে পারে।
তবে শুধু বাজারের পরিস্থিতিই নয়,বিনিয়োগকারীর নিজের মনও অনেক সময় বড় ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বাজার একটু পড়ে গেলেই অনেকে ভয় পেয়ে তাড়াহুড়ো করে শেয়ার বিক্রি করে দেন। আবার বাজার দ্রুত বাড়তে থাকলে অন্যরা লাভ করছে দেখে FOMO বা বাদ পড়ে যাওয়ার ভয় থেকে বেশি দামে শেয়ার কিনে ফেলেন। পরে বাজার ঘুরে গেলে তখন আফসোস করার সুযোগ ছাড়া আর কিছু থাকে না।
লিভারেজ বা মার্জিন ব্যবহার করলে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। নিজের টাকার পাশাপাশি ধার করা টাকা দিয়ে বিনিয়োগ করলে বাজার আপনার বিপরীতে গেলে ক্ষতির পরিমাণ দ্রুত বাড়তে পারে। তাই নতুন বিনিয়োগকারীদের এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ পদ্ধতি ব্যবহারের আগে বিষয়টি ভালোভাবে বোঝা জরুরি।
বাংলাদেশের শেয়ার বাজারেও বিভিন্ন সময় অর্থনৈতিক পরিস্থিতি,সরকারি নিয়মের পরিবর্তন,কোম্পানির খবর,বাজারে কারসাজির অভিযোগ কিংবা কোনো গুজবের কারণে শেয়ারের দামে বড় পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। তাই অন্যের কথায় বা শুধু কোনো ফেসবুক পোস্ট দেখে শেয়ার কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।
সবশেষে একটা কথা মনে রাখা ভালো,শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ মানেই নিশ্চিত লাভ নয়। মূলধনের একটা অংশ হারানোর ঝুঁকি সবসময় থাকে। তাই বিনিয়োগ করার আগে নিজের আর্থিক অবস্থা ও ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা বুঝে নিন। সব টাকা একটি কোম্পানি বা একটি খাতে না রেখে বিভিন্ন জায়গায় ভাগ করে রাখার চেষ্টা করুন। দীর্ঘমেয়াদে চিন্তা করুন এবং এমন টাকা বিনিয়োগ করুন,যেটা হারালেও আপনার দৈনন্দিন জীবনে বড় ধরনের সমস্যা হবে না।
শেয়ার বাজারকে রাতারাতি ধনী হওয়ার পথ হিসেবে না দেখে শেখার ও ধীরে এগোনোর জায়গা হিসেবে দেখাই ভালো। জ্ঞান,ধৈর্য এবং ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন থাকলে ভুল সিদ্ধান্তের সম্ভাবনা অনেকটাই কমানো যায়।
বাজার ওঠানামা করলে কীভাবে টাকা কমে যেতে পারে
শেয়ার বাজারে টাকা হারানোর অন্যতম বড় কারণ হলো শেয়ারের দামের এই ওঠানামা। আজ কোনো শেয়ারের দাম ১০ টাকা বাড়ল,আপনি ভাবলেন বেশ ভালো লাভ হবে। কিন্তু পরের দিনই যদি দাম ১৫ বা ২০ টাকা কমে যায়,তখন পরিস্থিতি একেবারেই বদলে যেতে পারে। শেয়ার বাজারে দামের এই দ্রুত পরিবর্তনকেই সাধারণভাবে ভোলাটিলিটি বলা হয়।বাজার কখন বাড়বে আর কখন কমবে,সেটা আগে থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। তাই শুধু কয়েক দিনের লাভ দেখে বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়ে যাওয়া ঠিক নয়। আবার বাজার একটু পড়ে গেলেই ভয় পেয়ে সব শেয়ার বিক্রি করে দেওয়াও ভালো সিদ্ধান্ত নাও হতে পারে। অতীতে বাংলাদেশের শেয়ার বাজারে বড় ধরনের দরপতন হয়েছে,যার কারণে অনেক বিনিয়োগকারী উল্লেখযোগ্য ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
বিশেষ করে যারা অল্প সময়ের মধ্যে বেশি লাভ করতে চান,তাদের জন্য এই ওঠানামা বেশ চাপের হতে পারে। প্রতিদিন শেয়ারের দাম কত বাড়ল বা কমল,সেটা দেখতে থাকলে অনেক সময় আবেগের বশে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। আজ দাম কমেছে দেখে বিক্রি করে দিলেন,অথচ কয়েক দিন পর সেটাই আবার বেড়ে গেল,এমন ঘটনাও ঘটতে পারে।দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ করলেও ধৈর্য ধরে থাকতে হয়। বাজারে সাময়িক দরপতন হলেই ভয় পেয়ে সিদ্ধান্ত বদলে ফেললে পরিকল্পনা অনুযায়ী বিনিয়োগ করা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে এর মানে এই নয় যে লোকসান হলেও সবসময় শেয়ার ধরে রাখতে হবে। কোম্পানির অবস্থা ও নিজের বিনিয়োগের উদ্দেশ্য নিয়মিত পর্যালোচনা করা দরকার।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো,শেয়ার বাজারে আবেগ দিয়ে সিদ্ধান্ত না নেওয়া। অন্য কেউ লাভ করেছে দেখে হুট করে শেয়ার কেনা কিংবা বাজার পড়েছে দেখে আতঙ্কে বিক্রি করা দুটোই ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই বিনিয়োগের আগে ঝুঁকিটা বুঝে নিন এবং এমন পরিমাণ টাকা বিনিয়োগ করুন,যেটা হারালে আপনার দৈনন্দিন জীবনে বড় সমস্যা হবে না।
কোম্পানি সম্পর্কে না জেনে শেয়ার কিনলে কী হতে পারে
অনেকেই কোনো শেয়ারের দাম বাড়তে দেখলেই মনে করেন,এখনই কিনলে হয়তো আরও লাভ করা যাবে। তাই বেশি কিছু না ভেবেই তাড়াহুড়ো করে টাকা বিনিয়োগ করে ফেলেন। কিন্তু স্টক মার্কেট বা শেয়ার বাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এটাই বড় ভুলগুলোর একটি। যে কোম্পানিতে টাকা দিচ্ছেন,সেই কোম্পানির ব্যবসা কেমন,ঋণের পরিমাণ কত,নিয়মিত লাভ করছে কি না,পরিচালনা পর্ষদ কেমন এবং ভবিষ্যতে ব্যবসা বাড়ার সম্ভাবনা আছে কি না,এসব অন্তত কিছুটা যাচাই করে নেওয়া দরকার।
শুধু শেয়ারের দাম বাড়ছে দেখেই কোনো কোম্পানিকে ভালো মনে করা ঠিক নয়। কারণ আজ দাম বাড়লেও পরে সেটি কমে যেতে পারে। আবার কোনো কোম্পানির ব্যবসার ভিত দুর্বল হলে দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগকারীকেই ক্ষতির মুখে পড়তে হতে পারে।
ধরুন,কেউ একটি কোম্পানির শেয়ার কিনলেন শুধু এই কারণে যে গত কয়েকদিন ধরে সেটির দাম বাড়ছিল। পরে খোঁজ নিয়ে দেখলেন,কোম্পানিটির অনেক ঋণ রয়েছে,ব্যবসায় তেমন লাভ হচ্ছে না বা ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা আছে। তখন শেয়ারের দাম কমে গেলে লোকসান সামলানো কঠিন হয়ে যেতে পারে।তাই কোনো কোম্পানিকে না বুঝে শুধু অন্যের কথা,ফেসবুকের পোস্ট বা শেয়ারের দামের ওঠানামা দেখে বিনিয়োগ করা ঠিক নয়। টাকা লাগানোর আগে কোম্পানির আর্থিক অবস্থা,ব্যবসার ধরন এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা সম্পর্কে যতটা সম্ভব তথ্য সংগ্রহ করুন।
সহজভাবে বললে,আপনি যে কোম্পানির শেয়ার কিনছেন,সেখানে নিজের টাকা দেওয়ার আগে কোম্পানিটাকে একটু চিনে নেওয়া দরকার। না হলে বিনিয়োগ আর অনুমানের মধ্যে তেমন পার্থক্য থাকে না। শেয়ার বাজারে লাভের সুযোগ যেমন আছে, তেমনি ভুল সিদ্ধান্তে বড় ধরনের ক্ষতির সম্ভাবনাও আছে।
দেশের অর্থনীতিতে সমস্যা হলে শেয়ারবাজারে কী প্রভাব পড়ে
বাংলাদেশের শেয়ারবাজারের ওপর দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির বেশ প্রভাব পড়ে। অর্থনীতিতে ভালো-মন্দ যা কিছু ঘটে,তার একটা প্রভাব অনেক সময় শেয়ারবাজারেও দেখা যায়। যেমন ডলারের দাম বেড়ে গেলে,জ্বালানির খরচ বাড়লে বা মূল্যস্ফীতি বেশি হলে অনেক কোম্পানির ব্যবসার খরচ বেড়ে যায়। এতে তাদের লাভ কমতে পারে এবং এর প্রভাব শেয়ারের দামেও পড়তে পারে।তাই শুধু যে কোম্পানির শেয়ার কিনছেন,সেই কোম্পানির খবর জানলেই হবে না। দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অবস্থার দিকেও একটু নজর রাখা দরকার। কারণ একটি কোম্পানি ভালোভাবে ব্যবসা করলেও অর্থনীতিতে বড় ধরনের সমস্যা দেখা দিলে সেটার প্রভাব পুরো বাজারে পড়তে পারে।
এর পাশাপাশি রাজনৈতিক পরিস্থিতি,সুদের হার,মুদ্রার বিনিময় হার এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অবস্থাও শেয়ারবাজারে প্রভাব ফেলতে পারে। এসব কারণে কখনো বাজার দ্রুত বাড়ে,আবার কখনো অল্প সময়ের মধ্যে অনেকটা নেমেও যেতে পারে।তাই শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করার আগে শুধু অন্যের পরামর্শের ওপর নির্ভর না করে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে কিছুটা ধারণা নেওয়া ভালো। বাজারের সবকিছু নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব নয়,কিন্তু তথ্য জেনে ও ঝুঁকি বুঝে বিনিয়োগ করলে ভুল সিদ্ধান্তের সম্ভাবনা কিছুটা কমানো যায়।
গুজবে কান দিয়ে অন্যদের দেখে শেয়ার কেনার ঝুঁকি
ফেসবুক বা হোয়াটসঅ্যাপের বিভিন্ন গ্রুপে শেয়ারবাজার নিয়ে নানা ধরনের খবর খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কেউ হয়তো লিখল,কোনো কোম্পানি বড় অর্ডার পেয়েছে বা কয়েক দিনের মধ্যে সেই কোম্পানির শেয়ারের দাম দ্বিগুণ হয়ে যাবে। এমন খবর দেখে অনেকেই যাচাই না করেই শেয়ার কিনতে শুরু করেন। এখানেই বিপদটা তৈরি হয়।অনেক সময় এসব খবরের কোনো সত্যতা থাকে না,আবার কিছু খবর সত্য হলেও সেটাকে বাড়িয়ে বলা হয়। প্রথমে অনেক মানুষ শেয়ার কিনতে শুরু করায় দাম কিছুটা বেড়ে যেতে পারে। কিন্তু পরে যখন বোঝা যায় খবরটি ঠিক ছিল না,তখন অনেকেই একসঙ্গে শেয়ার বিক্রি করতে শুরু করেন। ফলে দাম দ্রুত কমে যেতে পারে।বিশেষ করে নতুন বিনিয়োগকারীরা অন্যদের দেখে তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন। পরে দাম কমে গেলে তখন বুঝতে পারেন,শুধু মানুষের কথায় ভরসা করে বিনিয়োগ করা ঠিক হয়নি।
তাই ফেসবুক পোস্ট,গ্রুপের আলোচনা বা কারও মুখের কথাকে বিনিয়োগের একমাত্র ভিত্তি বানাবেন না। কোনো খবর শুনলে আগে সেটার সত্যতা যাচাই করুন এবং কোম্পানি সম্পর্কে নিজে কিছুটা খোঁজখবর নিন। বাজারে সবাই কোনো একটি শেয়ার কিনছে দেখেই আপনাকেও কিনতে হবে,এমন কোনো নিয়ম নেই।শেয়ারবাজারে নিজের টাকা বিনিয়োগ করছেন,তাই সিদ্ধান্তটাও নিজের বুঝে নেওয়া ভালো। একটু সময় নিয়ে যাচাই করে বিনিয়োগ করলে গুজবের পেছনে ছুটে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঝুঁকি অনেকটাই কমানো যায়।
প্রতারণার ফাঁদে পড়ে বা শেয়ারের দাম কারসাজির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া
শেয়ারবাজারে আরেকটি বড় ঝুঁকি হলো দাম কারসাজি। কিছু অসাধু ব্যক্তি বা চক্র কোনো শেয়ারের দাম কৃত্রিমভাবে বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারে। দাম বাড়তে দেখে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অনেকে মনে করেন,এই শেয়ার হয়তো আরও বাড়বে। তখন তারা তাড়াহুড়ো করে কিনতে শুরু করেন। পরে কারসাজিকারীরা তাদের শেয়ার বিক্রি করে সরে গেলে দাম হঠাৎ কমে যেতে পারে। এতে যারা বেশি দামে শেয়ার কিনেছেন,তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েন।কখনো কোনো কোম্পানির শেয়ারের দাম কয়েক দিনের মধ্যে অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যেতে দেখা যায়। কিন্তু সেই দাম বাড়ার পেছনে কোম্পানির ব্যবসা বা আর্থিক অবস্থার সঙ্গে মিল আছে এমন কোনো পরিষ্কার কারণ নাও থাকতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে একটু সতর্ক হওয়া দরকার। শুধু দাম বাড়ছে দেখেই শেয়ার কেনা নিরাপদ সিদ্ধান্ত নয়।
বিশেষ করে নতুন বিনিয়োগকারীরা অন্যদের লাভের গল্প শুনে সহজেই প্রভাবিত হতে পারেন। কেউ হয়তো বলল,এই শেয়ার কিনলে দ্রুত লাভ হবে,আর সেটাই বিশ্বাস করে টাকা বিনিয়োগ করে ফেললেন। পরে দাম কমে গেলে তখন আফসোস করা ছাড়া অনেক সময় কিছু করার থাকে না।তাই কোনো শেয়ারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে দেখলে আগে কারণটা খুঁজে দেখুন। কোম্পানির অফিসিয়াল তথ্য,আর্থিক প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য তথ্য যাচাই করুন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুজব বা অপরিচিত কারও পরামর্শের ওপর ভরসা করে বিনিয়োগ করা ঠিক নয়।
সরকারি নিয়ম বদলালে বিনিয়োগকারীদের কী ধরনের সমস্যা হতে পারে
শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এমন কিছু ঝুঁকি আছে,যেগুলো আমাদের নিজের হাতে থাকে না। এর মধ্যে সরকারি নিয়মকানুনের পরিবর্তনও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সরকার বা নিয়ন্ত্রক সংস্থা কোনো নতুন নিয়ম চালু করলে সেটার প্রভাব শেয়ারবাজারে পড়তে পারে।যেমন,মার্জিন ঋণের নিয়ম পরিবর্তন করা হলে বা কোনো খাতে করের নিয়ম বদলালে সংশ্লিষ্ট কোম্পানি ও বিনিয়োগকারীদের ওপর তার প্রভাব পড়তে পারে। আবার কোনো নতুন নীতির কারণে ব্যবসার খরচ বেড়ে গেলে কিছু কোম্পানির লাভ কমে যেতে পারে। এসব বিষয় শেষ পর্যন্ত শেয়ারের দামেও প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে নিয়ম পরিবর্তন হলেই যে পুরো বাজার অবশ্যই পড়ে যাবে,এমনটা বলা ঠিক নয়। এর প্রভাব নির্ভর করে কী ধরনের নিয়ম পরিবর্তন হয়েছে,কোন কোম্পানি বা খাতের ওপর তার প্রভাব পড়ছে এবং বিনিয়োগকারীরা বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন তার ওপর।বিশেষ করে যারা ধার করে বা মার্জিন ঋণ নিয়ে শেয়ার কেনেন,তাদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। বাজার বা কোনো শেয়ারের দাম কমে গেলে ঋণের টাকা পরিশোধের চাপ তৈরি হতে পারে। ফলে লোকসান সামলানো আরও কঠিন হয়ে যেতে পারে।
তাই শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করার আগে দেশের অর্থনীতি ও সংশ্লিষ্ট সরকারি নীতিমালার বিষয়ে কিছুটা ধারণা রাখা ভালো। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার প্রকাশিত তথ্য নিয়মিত দেখলে নতুন নিয়ম বা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত সম্পর্কে আপডেট থাকা যায়।সবকিছু নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব নয়। তবে গুরুত্বপূর্ণ খবর ও নিয়মকানুন সম্পর্কে আগে থেকে জানার চেষ্টা করলে হঠাৎ কোনো পরিবর্তনের কারণে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঝুঁকি কিছুটা কমানো যায়।
ধার করে শেয়ার কিনলে কী ধরনের বিপদ হতে পারে
অনেক নতুন বিনিয়োগকারী নিজের জমানো টাকার বাইরে গিয়ে ধার করে বা মার্জিন ঋণ নিয়ে শেয়ার কিনতে শুরু করেন। মনে হয়,বেশি টাকা বিনিয়োগ করতে পারলে লাভও হয়তো বেশি হবে। কিন্তু বাস্তবে এতে ঝুঁকিটাও অনেক বেড়ে যায়।ধরুন,আপনি নিজের ৫০ হাজার টাকার সঙ্গে আরও ৫০ হাজার টাকা ধার করে শেয়ার কিনলেন। পরে বাজারের দাম কমে গেল। তখন শুধু আপনার বিনিয়োগের মূল্যই কমবে না,ধার করা টাকাটাও সুদসহ ফেরত দিতে হবে। অর্থাৎ বাজার থেকে যে টাকা হারালেন,সেই ক্ষতির সঙ্গে ঋণ পরিশোধের চাপও থাকবে।বাজার দীর্ঘ সময় খারাপ থাকলে এই চাপ আরও বাড়তে পারে। তখন অনেকেই মানসিকভাবে চাপে পড়ে তাড়াহুড়ো করে শেয়ার বিক্রি করে দেন। এতে লোকসান আরও বড় হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
তাই শেয়ারবাজারে নতুন হলে আগে নিজের সামর্থ্যের মধ্যে থেকেই শুরু করা ভালো। এমন টাকা বিনিয়োগ করুন,যেটা হারালে আপনার দৈনন্দিন জীবন বা পরিবারের প্রয়োজনীয় খরচে সমস্যা হবে না।বিশেষ করে ধার করে বা ঋণ নিয়ে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করার আগে ঝুঁকিটা খুব ভালোভাবে বুঝে নেওয়া দরকার। বেশি টাকা দিয়ে শুরু করলেই যে বেশি লাভ হবে,এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। বরং বাজার বিপরীত দিকে গেলে ক্ষতির পরিমাণও দ্রুত বেড়ে যেতে পারে।
সব টাকা এক জায়গায় বিনিয়োগ করলে যে ঝুঁকি হতে পারে
অনেকেই কোনো একটি কোম্পানির শেয়ারকে খুব ভালো মনে করে নিজের বেশিরভাগ টাকা সেখানে বিনিয়োগ করে ফেলেন। মনে হয়,কোম্পানিটি ভালো করলে একসঙ্গে বড় লাভ হবে। কিন্তু সমস্যা হলো,একটি কোম্পানির ওপর পুরোপুরি নির্ভর করলে ঝুঁকিও অনেক বেড়ে যায়।ধরুন,সেই কোম্পানির ব্যবসায় হঠাৎ সমস্যা দেখা দিল,লাভ কমে গেল,ব্যবস্থাপনায় বড় কোনো পরিবর্তন হলো বা কোনো নেতিবাচক খবর প্রকাশ পেল। তখন শেয়ারের দাম দ্রুত কমে যেতে পারে। আপনার বেশিরভাগ টাকা যদি ওই একটি কোম্পানিতেই থাকে,তাহলে ক্ষতির পরিমাণও অনেক বেশি হবে।এই কারণেই বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ডাইভার্সিফিকেশন বা ঝুঁকি ছড়িয়ে রাখার কথা বলা হয়।
অর্থাৎ সব টাকা একটি জায়গায় না রেখে বিভিন্ন কোম্পানি বা ভিন্ন ভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করা। এতে কোনো একটি কোম্পানি খারাপ করলেও অন্য বিনিয়োগগুলো ভালো করলে পুরো পোর্টফোলিওর ওপর চাপ কিছুটা কম হতে পারে।তবে বিভিন্ন জায়গায় টাকা ছড়িয়ে দিলেই ঝুঁকি পুরোপুরি চলে যায় না। বাজারে বড় ধরনের দরপতন হলে একাধিক শেয়ারের দাম একসঙ্গে কমতে পারে। তাই কতটা এবং কোথায় বিনিয়োগ করবেন, সেটা নিজের আর্থিক অবস্থা ও ঝুঁকি নেওয়ার সামর্থ্য বুঝে ঠিক করা উচিত।একটি শেয়ারকে যতই ভালো মনে হোক না কেন,নিজের পুরো সঞ্চয় সেখানে ঢেলে দেওয়া ঠিক নয়। আগে ভালোভাবে বুঝুন,তারপর পরিকল্পনা করে বিনিয়োগ করুন এবং ঝুঁকি এক জায়গায় জমিয়ে না রেখে যতটা সম্ভব ছড়িয়ে রাখুন।
শেষ কথাঃ স্টক মার্কেট বা শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করার ঝুঁকি
শেষ কথাটা হলো,শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করলে কিছুটা ঝুঁকি থাকবেই। তবে ভালোভাবে শিখে,বুঝে এবং পরিকল্পনা করে এগোলে সেই ঝুঁকি অনেকটাই সামলানো যায়। শুরুতেই বড় অঙ্কের টাকা না দিয়ে অল্প দিয়ে শুরু করা,যে কোম্পানিতে বিনিয়োগ করছেন সে সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া এবং বাজারের ওঠানামা দেখে তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত না নেওয়া।
শেয়ারবাজার থেকে লাভ করা সম্ভব,কিন্তু এটাকে দ্রুত টাকা দ্বিগুণ করার জায়গা ভাবা ঠিক নয়। এখানে ধৈর্য এবং বাস্তব জ্ঞান দুটোই দরকার। অন্যের কথায় বা হুজুগে পড়ে বিনিয়োগ করলে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তাই আগে শিখুন,নিজের সামর্থ্য বুঝুন,তারপর ধীরে ধীরে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো,এমন টাকা বিনিয়োগ করবেন না যেটা হারালে আপনার দৈনন্দিন জীবন বা পরিবারের ওপর বড় চাপ পড়ে।
আর এই লেখার কোনো টিপস যদি আপনার কাজে লাগে,তাহলে অবশ্যই মন্তব্য করে আপনার অভিজ্ঞতা জানাবেন।এই লেখাটি পড়ে আপনি বিষয়টি সম্পর্কে ভালো ধারণা পেয়েছেন। যদি আপনার ভালো লাগে,তাহলে অবশ্যই বন্ধুদের সাথে শেয়ার করে তাদেরও জানার সুযোগ করে দিতে পারেন।এতক্ষণ সময় নিয়ে পুরো আর্টিকেলটি পড়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

.webp)
.webp)
অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url