আপনার শিশু হাম-এ আক্রান্ত হলে কী করণীয়?জেনে নিন।
শিশুর হাম হলে ভয় না পেয়ে প্রথমেই সঠিক যত্ন নেওয়া খুব জরুরি। কারণ এই রোগে অনেক সময় জ্বর,কাশি,চোখ লাল হওয়া আর শরীরে ফুসকুড়ির মতো সমস্যা দেখা দেয়। ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে একটু অবহেলাও বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই শুরু থেকেই সতর্ক থাকা এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
শিশু অসুস্থ হলে পুরো পরিবারই চিন্তায় পড়ে যায়,আর হাম হলে সেই দুশ্চিন্তা আরও বেড়ে যায়।হাম শিশুদের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া একটি ভাইরাসজনিত রোগ।তাই শিশুকে সুস্থ রাখতে সময়মতো যত্ন ও চিকিৎসা খুবই প্রয়োজন।চলুন আজকের আর্টিকেলটিতে বিষয়টি বিস্তারিতভাবে জেনে নিই।
পেজ সূচিপএঃ আপনার শিশু হাম-এ আক্রান্ত হলে কী করণীয়?বিস্তারিতভাবে জেনে নিন।
- আপনার শিশু হাম-এ আক্রান্ত হলে কী করণীয়?
- হাম কী?
- হাম রোগের লক্ষণ
- হাম থেকে সুরক্ষার উপায়
- হাম-এ আক্রান্ত শিশুর যত্ন
- যেসব শিশু হামের ঝুঁকিতে রয়েছে
- কেন হাম বিপজ্জনক?
- দেশে মারাত্নকভাবে বাচ্চাদের হাম বেড়ে গেছে!সতর্ক থাকুন
- হাম হলে কেনো ভিটামিন 'এ 'দিবেন
- হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ,এই অবস্থায় শিশুকে স্কুলে পাঠাবেন না
- হাম হলে কোন লক্ষণ দেখলেই বুছবেন অবস্ত্যা খারাপের দিকে যাচ্ছে
- বাংলাদেশে দ্রুত হাম ছড়াচ্ছে,শিশুকে বাঁচাতে যা করণীয়-
- শেষ কথাঃ আপনার শিশু হাম-এ আক্রান্ত হলে কী করণীয়
আপনার শিশু হাম-এ আক্রান্ত হলে কী করণীয়?
হাম হলে অবশ্যই চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। চিকিৎসক রোগীকে ভালোভাবে দেখার পর শনাক্ত করতে পারবেন আসলেই হাম হয়েছে কিনা। সাধারণত তিন দিনের চিকিৎসাতেই এই রোগের জ্বর ভালো হয় এবং সাত দিনের মধ্যেই হামে আক্রান্ত রোগী পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠে। হামে আক্রান্ত রোগীকে নিয়মিত গোসল করাতে হবে। আর একটু পর পর ভেজা তোয়ালে/গামছা বা নরম কাপড় দিয়ে শরীর মুছিয়ে দিতে হবে। রোগীর বেশি জ্বর হলে বমিও হতে পারে। তবে এতে চিন্তিত হওয়ার কারণ নেই। এ ক্ষেত্রে ওষুধ খেতে হবে। তবে কোনো ভাবেই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া রোগীকে ওষুধ খাওয়ানো যাবে না।
হাম হলে রোগীকে পুরোপুরি বিশ্রামে থাকতে হয়। এ সময় বাসা থেকে বের না হওয়াই ভালো। অবশ্যই প্রচুর পরিমাণে পানি পান করতে হবে। আর স্বাভাবিক খাবারদাবারের পাশাপাশি রোগীকে বেশি বেশি তরল খাবারও দিতে হবে।সময়মতো চিকিৎসা করানো না হলে হাম থেকে ফুসফুস প্রদাহ বা নিউমোনিয়া,কানে রোগজীবাণু সংক্রমণ এমনকি মস্তিষ্কে প্রদাহ রোগ হতে পারে। তাই হামের নিরাপদ চিকিৎসা করানো খুবই জরুরি।
আপনার শিশু হাম-এ আক্রান্ত হলে বিশেষ করণীয়ঃ
- আক্রান্ত শিশুকে অন্যদের থেকে আলাদা রাখুন।
- দ্রুত নিকটস্থ্য স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যান এবং ডাক্তারের পরাপর্শ নিন।
- ডাক্তারের পরাপর্শ ছাড়া ঔষধ খাওয়াবেন না।
- আক্রান্ত শিশুর পরিচর্যার সময় সংক্রমণ থেকে সুরক্ষার জন্য মাস্ক ব্যবহার করুন।
- আক্রান্ত শিশুকে স্পর্শ করার আগে ও পরে সাবান ও পানি দিয়ে দুই হাত ভালোভাবে ধুয়ে নিন।
হাম কী?
হাম বা রুবিওলা একটি অত্যন্ত ছোয়াঁচে ও তীব্র ভাইরাসঘটিত রোগ। প্যারামক্সিভাইরাস গোত্রের মর্বিলিভাইরাস গণের অন্তর্গত একটি ভাইরাসের কারণে রোগটি ঘটে থাকে;ভাইরাসটির পূর্ণ বৈজ্ঞানিক নাম মিজল্স মর্বিলিভাইরাস (Measles morbillivirus)।ভাইরাসটি প্রথমে শ্বাসনালিতে সংক্রমিত হয়,এরপর রক্তের মাধ্যমে দেহের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে।হাম বিশ্বের সবচেয়ে সংক্রামক রোগগুলির মধ্যে একটি।বিশেষ করে যেসব শিশুর টিকা নেওয়া হয়নি বা যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম,তাদের জন্য এই রোগটি বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। একজন আক্রান্ত ব্যক্তির কাছাকাছি থাকলে প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ সংক্রমিত হতে পারে,যা হামকে অত্যন্ত সংক্রামক একটি রোগ হিসেবে চিহ্নিত করে।
হাম রোগের লক্ষণ
হাম সাধারণত ভাইরাস সংক্রমণের ৭ থেকে ১৪ দিন পর ঠান্ডা লাগার মতো উপসর্গের মাধ্যমে শুরু হয়। এর প্রধান লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে উচ্চ জ্বর,তীব্র শুকনো কাশি,সর্দি,লাল ও পানিভরা চোখ,এবং পরবর্তী সময়ে মুখের ভেতরে ছোট সাদা দাগ ও সারা শরীরে লালচে ফুসকুড়ি।
হামের লক্ষণগুলো সাধারণত কয়েকটি ধাপে প্রকাশ পায়ঃ
- উচ্চ জ্বর (৩-৫ দিন থাকতে পারে):জ্বর খুব দ্রুত ১০৪ থেকে ১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত উঠতে পারে।
- শরীরে লাল ফুসকুড়ি (প্রথমে মুখে,পরে সারা শরীরে ছড়ায়)।
- কাশিঃঅন্যান্য উপসর্গের মধ্যে রয়েছে শুকনো কাশি।
- নাক দিয়ে পানি পড়া।
- চোখ লাল হওয়া বা পানি পড়া।
- খাওয়ার অনীহা বা দুর্বলতা।
হাম থেকে সুরক্ষার উপায়
- শিশুর বয়স ৯ মাস পূর্ণ হলে হাম-রুবেলা (এমআর)১ম ডোজ এবং
- ১৫ মাস পূর্ণ হলে ২য় ডোজ টিকা নিশ্চিত করুন।
- ২ বছরের কম বয়সি যে সকল শিশু হাম-রুবেলা (এমআর)টিকা এখনো গ্রহণ করেনি,তাদের জন্য অতি দ্রুত এই টিকা নিশ্চিত করুন।
- নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে হাম-রুবেলা (এমআর)টিকা দেওয়া হয়।আপনার নিকটস্থ ইপিআই টিকাদান কেন্দ্র থেকে শিশুর টিকা নিন।
- মনে রাখবেনঃসম্পূর্ণ সুরক্ষা পেতে আপনার শিশুকে অবশ্যই সময়মত দুই ডোজ টিকা দিতে হবে।
হাম-এ আক্রান্ত শিশুর যত্ন
- এ সময় আক্রান্ত শিশুর খাবার,পানীয় ও অন্যান্য স্বাভাবিক পরিচর্যা অব্যাহত রাখতে হবে।
- যে সকল শিশু বুকের দুধ পান করে- তাদেরকে নিয়মিত বুকের দুধ খাওয়ান।
- ভিটামিন-এ সমৃদ্ধ পুষ্টিকর খাবার,যেমন:গাজর,মিষ্টি কুমড়া,মিষ্টি আলু,পেঁপে,পালং শাক ও অন্যান্য সবুজ শাকসবজি খাওয়ান।
- পর্যাপ্ত পানি পান করান।
যেসব শিশু হামের ঝুঁকিতে রয়েছে
- টিকা দেওয়া হয়নি
- দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার শিশু
- ভিড়পূর্ণ জায়গায় বেশি থাকা শিশু
- অসুস্থ বা অন্য সংক্রমণ থাকলে সহজে আক্রান্ত
- ছোট শিশু (১-৫ বছর)
কেন হাম বিপজ্জনক?
সব ক্ষেত্রে হাম গুরুতর হয় না,তবে এটি একেবারে হালকাও নয়। কিছু শিশুর ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া,ডায়রিয়া বা মস্তিষ্কের সমস্যা হতে পারে। বিশেষ করে অপুষ্ট বা টিকা না নেওয়া শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি থাকে। তাই শুরু থেকেই সতর্ক থাকা জরুরি।
- এটি অত্যন্ত সংক্রামক (এক জন থেকে ১৮ জন আক্রান্ত হতে পারে)।
- চিকিৎসা না করালে নিউমোনিয়া,অন্ধত্ব ও মস্তিস্কের ক্ষতি হতে পারে।
জরুরি মনে রাখুনঃ
- হামের নির্দিষ্ট কোনো ওষধ নেই,টিকাই একমাএ সুরক্ষা।
- টিকা অত্যন্ত নিরাপদ,সামান্য জ্বর হতে পারে যা স্বাভাবিক।
দেশে মারাত্নকভাবে বাচ্চাদের হাম বেড়ে গেছে!সতর্ক থাকুন
- টিলেটালা পোশাক
- ঘর ঠান্ডা রাখা
- চামড়া পরিস্কার রাখতে সাবান ও জল ব্যবহার
- ডাক্তারের পরামর্শ
হাম হলে কেনো ভিটামিন "এ" দিবেন
ভিটামিন A শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। এটি চোখের সুরক্ষা দেয় এবং জটিলতা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে অপুষ্ট শিশুদের জন্য এটি খুবই উপকারী।হাম ভাইরাসজনিত রোগ হওয়ায় এর নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই। সাধারণত লক্ষণ অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়া হয়। সঠিক যত্ন,বিশ্রাম এবং পুষ্টিকর খাবারেই বেশিরভাগ শিশু সুস্থ হয়ে ওঠে।সাধারণত অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন হয় না,কারণ এটি ভাইরাসজনিত রোগ। তবে যদি নিউমোনিয়া বা অন্য ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ যুক্ত হয়, তখন ডাক্তার অ্যান্টিবায়োটিক দিতে পারেন।
হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ,এই অবস্থায় শিশুকে স্কুলে পাঠাবেন না
হাম খুব দ্রুত একজন থেকে আরেকজনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। তাই শিশুর হাম হলে তাকে স্কুলে বা ভিড়ের জায়গায় পাঠানো ঠিক নয়। এতে অন্য শিশুরাও সহজে আক্রান্ত হতে পারে। এই সময় শিশুকে বাসায় বিশ্রামে রাখা এবং সম্পূর্ণ সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত আলাদা যত্ন নেওয়াই সবচেয়ে ভালো।হাম একটি খুবই ছোঁয়াচে রোগ। তাই শিশুর শরীরে হাম দেখা দিলে তাকে স্কুলে পাঠানো উচিত নয়। কারণ এতে সহপাঠীদের মধ্যেও রোগটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। শিশুকে এই সময় বাসায় রেখে বিশ্রাম ও সঠিক যত্ন দেওয়া দরকার।শিশুর হাম হলে তাকে কিছুদিন স্কুল থেকে দূরে রাখুন। কারণ হাম সহজেই অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে যায়। পুরোপুরি সুস্থ হওয়ার আগে বাইরে গেলে অন্য শিশুদেরও ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।অনেকেই জ্বর একটু কমলেই শিশুকে স্কুলে পাঠিয়ে দেন,কিন্তু হামের ক্ষেত্রে এটা ঠিক নয়। এই রোগ খুব দ্রুত ছড়ায়,তাই শিশুর সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়া পর্যন্ত বাসায় রাখাই নিরাপদ।হাম হলে শিশুর শরীর অনেক দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই স্কুলে পাঠানোর বদলে তাকে বিশ্রাম নিতে দিন। এতে শিশুও দ্রুত সুস্থ হবে এবং অন্যরাও সংক্রমণ থেকে নিরাপদ থাকবে।
হাম হলে কোন লক্ষণ দেখলেই বুছবেন অবস্ত্যা খারাপের দিকে যাচ্ছে
- শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া
- বারবার বমি বা কিছুই খেতে না পারা
- অতিরিক্ত দুর্বলতা বা অচেতন ভাব
- চোখ লাল,পানি পড়া,আলো সয্য না করা
- জ্বর কমার বদলে আরও বেড়ে যাওয়া
- ক্ষিছুনি হওয়া
বাংলাদেশে দ্রুত হাম ছড়াচ্ছে,শিশুকে বাঁচাতে যা করণীয়
- সময়মতো MR টিকা দিন
- আক্রান্ত শিশুর সংস্পর্শ এড়িয়ে চলুন
- ভিড়যুক্ত জায়গা থেকে শিশুদের দূরে রাখুন
- খাবার ও বুকের দুধ দিন
- ভিটামিন A নিশ্চিত করুন
- হাত ধোয়া ও পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন।
শেষ কথাঃ আপনার শিশু হাম-এ আক্রান্ত হলে কী করণীয়
শিশুদের মতো বড়দেরও হাম হতে পারে। তাই এখন হামের প্রতিষেধক হিসেবে বড়দের জন্যও আছে ‘এমএমআর’ টিকা। এ টিকা দেওয়া না থাকলে হাম হওয়ার আশঙ্কা থাকতে পারে। তবে,সাধারণত একবার হাম হলে দ্বিতীয়বার আর এ রোগ হওয়ার আশঙ্কা থাকে না। তবে সবাইকেই সতর্ক থাকতে হবে,কেননা হাম ছোঁয়াচে।
আজকের এই আর্টিকেলে আপনার শিশু হাম-এ আক্রান্ত হলে কী করণীয় নিয়ে কথা বলেছি।আশা করি,এই লেখাটি পড়ে আপনি বিষয়টি সম্পর্কে ভালো ধারণা পেয়েছেন। যদি আপনার ভালো লাগে,তাহলে অবশ্যই বন্ধুদের সাথে শেয়ার করে তাদেরও জানার সুযোগ করে দিতে পারেন।এতক্ষণ সময় নিয়ে পুরো আর্টিকেলটি পড়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

.webp)
.webp)
অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url