শবে মেরাজের নামাজের গুরুত্ব,বাস্তবতা ও সঠিক আমল।

শবে মেরাজ ইসলামের ইতিহাসে এক অতুলনীয় ও মহিমান্বিত রাত, যে রাতে মহান আল্লাহ উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের বিধান দান করেন। তাই শবে মেরাজের নামাজ শুধু একটি সাধারণ ইবাদত নয়, বরং এটি আল্লাহর সঙ্গে বান্দার সরাসরি সম্পর্ক স্থাপনের প্রতীক। 

                                                                                 
                                                                       
শবে-মেরাজের-নামাজের-গুরুত্ব-বাস্তবতা-ও-সঠিক-আমল

   


 অনেকেই শবে মেরাজের নামাজ নিয়ে নানা প্রশ্ন ও ভুল ধারণায় থাকেন।কোন নামাজ পড়তে হবে, কয় রাকাত, কীভাবে আদায় করতে হবে। নিচে আমি আপনাদের এসব বিষয় স্পষ্টভাবে জানা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

পেজ সেচিপএঃ শবে মেরাজের নামাজের গুরুত্ব,বাস্তবতা ও সঠিক আমল বিস্তারিত জেনে নিন।

শবে মেরাজের নামাজ কি?

শবে মেরাজের নামাজ বলতে সাধারণভাবে বোঝানো হয়,শবে মেরাজের রাতে আল্লাহর নৈকট্য লাভের আশায় আদায় করা নফল নামাজ। এই রাত ইসলামের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ শবে মেরাজেই মহান আল্লাহ উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের বিধান দেন। তাই শবে মেরাজের নামাজের মূল গুরুত্ব কোনো নির্দিষ্ট বিশেষ নামাজে নয়; বরং নামাজের গুরুত্ব অনুধাবন করা এবং নিয়মিত ফরজ নামাজ কায়েম করার মধ্যেই এর আসল তাৎপর্য নিহিত।

শবে মেরাজের নামাজ আছে কি?

ইসলামি শরিয়তের আলোকে শবে মেরাজের জন্য নির্দিষ্ট কোনো বিশেষ নামাজ (যেমন--এত রাকাত, নির্দিষ্ট সূরা দিয়ে) ফরজ বা সুন্নত হিসেবে প্রমাণিত নয়। কুরআন ও সহিহ হাদিসে শবে মেরাজের রাতে বিশেষ কোনো নির্ধারিত নামাজের নির্দেশ পাওয়া যায় না। তাই ভিত্তিহীন ও মনগড়া নিয়মে নামাজ পড়াকে ইসলাম সমর্থন করে না। তবে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে সাধারণ নফল নামাজ আদায় করা সম্পূর্ণ জায়েজ ও সওয়াবের কাজ।

শবে মেরাজের রাতে কোন নামাজ পড়বেন

শবে মেরাজের রাতে সাধারণ নফল নামাজ দুই রাকাত করে পড়া উত্তম। ফরজ নামাজগুলো যথাসময়ে আদায় করা সবচেয়ে জরুরি। এরপর সামর্থ্য অনুযায়ী নফল নামাজ, তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করা যেতে পারে। নামাজের পাশাপাশি কুরআন তিলাওয়াত, দরুদ শরীফ পাঠ, ইস্তেগফার ও দোয়া করলে এই রাতের বরকত আরও বৃদ্ধি পায়।

শবে মেরাজে বিশেষ নামাজ পড়া কি জায়েজ

সংক্ষিপ্ত ও স্পষ্টভাবে বললে---শবে মেরাজ উপলক্ষে নির্দিষ্ট কোনো "বিশেষ নামাজ" পড়া জায়েজ নয়,যদি সেটিকে ফরজ, সুন্নত বা নির্দিষ্ট সওয়াবের সাথে বাধ্যতামূলক হিসেবে ধরা হয়। কুরআন ও সহিহ হাদিসে শবে মেরাজের জন্য নির্দিষ্ট রাকাতসংখ্যা, নির্দিষ্ট সূরা বা বিশেষ নিয়মে নামাজ আদায়ের কোনো প্রমাণ নেই। তাই প্রচলিত কিছু "বিশেষ নামাজ" (যেমন---নির্দিষ্ট ১২ রাকাত, ২০ রাকাত ইত্যাদি)কে শবে মেরাজের নামাজ বলে চালু করা বিদআতের অন্তর্ভুক্ত।

তবে এর মানে এই নয় যে শবে মেরাজের রাতে নামাজ পড়াই যাবে না। আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে  সাধারণ নফল নামাজ,তাহাজ্জুদ নামাজ, ফরজ ও সুন্নত নামাজ যথাসময়ে আদায় করা সম্পূর্ণ জায়েজ ও সওয়াবের কাজ। এখানে নিয়ত হবে---নফল ইবাদত করা, কোনো নির্দিষ্ট "শবে মেরাজের নামাজ" হিসেবে নয়।

শবে মেরাজের নামাজ সম্পর্কে হাদিস

শবে মেরাজের নামাজ বিষয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো,এই রাতে নির্দিষ্ট কোনো বিশেষ নামাজের কথা সহিহ হাদিসে উল্লেখ নেই। তবে শবে মেরাজের সঙ্গে নামাজের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর, কারণ এই রাতেই পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের বিধান দেওয়া হয়, যা একাধিক সহিহ হাদিসে স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে।

রাসূলুল্লাহ বলেন---মেরাজের রাতে আল্লাহ তায়ালা প্রথমে ৫০ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করেন। পরে হযরত মূসা (আ.)-এর পরামর্শে রাসূল বারবার আল্লাহর দরবারে আবেদন করলে তা ৫ ওয়াক্তে কমিয়ে আনা হয়, কিন্তু সওয়াব রাখা হয় ৫০ ওয়াক্তের সমান।

  • সহিহ বুখারি, হাদিসঃ ৩৪৯
  • সহিহ মুসলিম, হাদিসঃ ১৬২

    এই হাদিসগুলো থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়,শবে মেরাজের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো নামাজের ফজিলত ও গুরুত্ব।

    শবে মেরাজের নামাজ বিদআত কি না

    শবে মেরাজের জন্য প্রচলিত "বিশেষ নামাজ"  বিদআত,যদি সেটিকে ফরজ বা সুন্নত হিসেবে ধরা হয়। সহিহ হাদিসে শবে মেরাজের জন্য নির্দিষ্ট রাকাত, সূরা বা নিয়মে নামাজ আদায়ের কোনো প্রমাণ নেই। তবে সাধারণ নফল নামাজ,তাহাজ্জুদ নামাজ এবংফরজ নামাজ যথাসময়ে আদায় করা সম্পূর্ণ জায়েজ ও সওয়াবের কাজ।

    শবে মেরাজে নফল নামাজ পড়ার নিয়ম

    শবে মেরাজের রাতে নির্দিষ্ট কোনো ফরজ বা সুন্নত নামাজ নেই। তাই নফল নামাজ পড়ার সময় কোনো নির্দিষ্ট রাকাত বা সূরা বাধ্যতামূলক নয়। তবে সুন্নাহ অনুযায়ী নফল নামাজের কিছু সাধারণ নিয়ম রয়েছে, যা অনুসরণ করলে ইবাদতের বরকত বৃদ্ধি পায়।

    যদিও শবে মেরাজের বিশেষ নামাজের হাদিস নেই, তবে নফল নামাজ ও রাতের ইবাদতের ফজিলত  সম্পর্কে সহিহ হাদিস রয়েছে---

    রাসূলুল্লাহ বলেন:

    "ফরজ নামাজের পর সর্বোত্তম নামাজ হলো রাতের নামাজ (তাহাজ্জুদ)।" সহিহ মুসলিম, হাদিসঃ ১১৬৩

    এ থেকে বোঝা যায়---শবে মেরাজের রাতে সাধারণ নফল ও তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করা সওয়াবের কাজ।

    শবে মেরাজে কত রাকাত নামাজ পড়তে হয়

     শবে মেরাজের নির্দিষ্ট কোনো রাকাত সংখ্যা নেই।সহিহ হাদিসে এই রাতে বিশেষ কোনো নির্দিষ্ট নামাজ বা রাকাত আদায়ের নির্দেশ নেই। তাই প্রচলিত কিছু "বিশেষ রাকাতের নামাজ" বিদআত হিসেবে গণ্য হয়।

    তবে শবে মেরাজের রাতে ইবাদত করতে চাইলে সাধারণ নফল নামাজ,তাহাজ্জুদ নামাজ এবংফরজ নামাজ যথাসময়ে আদায় করা জায়েজ। সাধারণভাবে মানুষ দুই রাকাত করে নফল নামাজ পড়ে থাকে, তবে এটি কোনো বাধ্যবাধকতা নয়---যত ইচ্ছা বা সামর্থ্য অনুযায়ী নামাজ পড়া যেতে পারে।

    শবে মেরাজের নামাজের সঠিক পদ্ধতি

    শবে মেরাজের রাতে নির্দিষ্ট কোনো ফরজ বা সুন্নত নামাজ সহিহ হাদিসে প্রমাণিত নয়। তাই "বিশেষ নামাজ" চালু করা বিদআত হিসেবে গণ্য হয়। তবে এই রাতে নফল নামাজ ও তাহাজ্জুদ আদায় করা সম্পূর্ণ জায়েজ এবং বরকতময়। শবে মেরাজে নামাজের সঠিক পদ্ধতি হলো সুন্নাহভিত্তিক ও খালিস নিয়তের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করে ইবাদত করা।

    ১। নামাজের প্রস্তুতিঃ

    • ওযু (শারীরিক ও মানসিক শুদ্ধি) করা
    • মন শান্ত ও মনোযোগী রাখা
    • নামাজ পড়ার আগে খালিস নিয়ত স্থাপন করা

      ২। রাকাত সংখ্যাঃ

      • নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা বাধ্যতামূলক নয়
      • সাধারণভাবে দুই রাকাত করে নফল নামাজ আদায় করা হয়
      • ইচ্ছা ও সামর্থ্য অনুযায়ী একাধিক রাকাত পড়া যেতে পারে

        ৩। কুরআন তিলাওয়াত ও সূরা

        • প্রতিটি রাকাতে আল-ফাতিহা পড়া আবশ্যক
        • এরপর ছোট কোনো সূরা পড়া যায়
        • নির্দিষ্ট সূরা বাধ্যতামূলক নয়

          ৪। দোয়া ও ইস্তেগফার

          • নামাজ শেষে দরুদ পাঠ করা
          • নিজের গুনাহের জন্য ইস্তেগফার ও তওবা করা
          • আল্লাহর নৈকট্য কামনা করে ব্যক্তিগত দোয়া করা
          ৫। সময় ও স্থিতি

          • রাতের শেষ ভাগে নফল নামাজ পড়া উত্তম
          • সম্ভব হলে তাহাজ্জুদ নামাজের সঙ্গে মিলিয়ে পড়া ভালো

            ৬। মনোভাব

            • নামাজ শুধু রাকাত সংখ্যা নয়
            • মনোযোগ, খালিস নিয়ত ও আল্লাহর সন্তুষ্টি মূল বিষয়
            • বিদআত বা অতিরিক্ত নিয়ম প্রয়োগ না করা

            শেষ কথাঃ শবে মেরাজের নামাজঃগুরুত্ব,বাস্তবতা ও সঠিক আমল।


            শবে মেরাজের নামাজ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, নামাজ কোনো সাধারণ ইবাদত নয়; বরং এটি আল্লাহর সঙ্গে বান্দার সরাসরি সম্পর্কের মাধ্যম। শবে মেরাজ উপলক্ষে আমাদের অঙ্গীকার হোক---নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা, গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিকে জীবনের প্রধান লক্ষ্য বানানো।

            আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে শবে মেরাজের নামাজের প্রকৃত শিক্ষা অনুযায়ী আমল করার ও  জীবন পরিচালনার তাওফিক দান করুন। আমিন।


              এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

              পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
              এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
              মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

              অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

              comment url
              Md. Asadul Islam
              Md. Asadul Islam
              একজন ডিজিটাল মার্কেটিং এক্সপার্ট ও অ্যাডমিন। তিনি অনলাইন ইনকাম, ব্লগিং, SEO ও টেকনোলজি নিয়ে নিয়মিত লেখালেখি করেন। ৫ বছরের অভিজ্ঞতায় তিনি শিক্ষার্থীদের অনলাইনে সফল হতে সহায়তা করে যাচ্ছেন।